আমাদের দেশের ৩.৫ কোটি মানুষের ঘরে নেই বিদ্যুতের আলো। ৪০ লাখ ঘরে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও সেসব সোলার সিস্টেমের ক্রয়মূল্য অনেক বেশি, যেখানে নিজেরা বানালে তৈরিতে খরচ পড়বে ১০ ভাগের এক ভাগ। ঠিক এ সমস্যা সমাধানের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আইডিয়া নিয়ে বিনামূল্যে সবার ঘরে আলো পৌঁছানোর কাজ করে যাচ্ছে লিটার অব লাইট বাংলাদেশ নামক একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সোলার দিয়ে সহজে তৈরি করা যায় এমন দুটি লাইটের আইডিয়া নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন একঝাঁক তরুণ-তরুণী। যে কেউ খুব সহজেই হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে যেন এই বাতি তৈরি করতে পারেন এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠান।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরের কোনো এক কোণে বেড়ে ওঠা তরুণ সানজিদুল আলম সিবান শানের নিজের পেশা এবং আগ্রহের জায়গা হলো উদ্ভাবনী বিষয়। ২০১৫ সালে ইউটিউব থেকে ‘বোতল বাতি’ নামক এক আইডিয়া ঢুকে যায় সানজিদুলের মাথায়, অনেক চিন্তাভাবনার পর যেই ভাবা সেই কাজ। সব চিন্তা মাথায় নিয়ে লেগে গেলেন ‘বোতল বাতি’ নামক এক ভিন্ন আইডিয়া নিয়ে; ভাবের সঙ্গে কাজের মিল রেখে তার কাছের কিছু তরুণদের নিয়ে তৈরি করেন এই বাতির আরও উন্নত সংস্করণ সোলার বোতল বাতি। নিজের কাজ থেকেই সময় বের করে নিজের অর্থায়নে শুরু করেন গবেষণা। ‘যদিও আমার ব্যাকগ্রাউন্ড ইলেকট্রনিক্স নয়, তারপরও ইঞ্জিনিয়ারিং টিমের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে লাইটের বিভিন্ন ভার্সন নিয়ে কাজ করতে হয়’ বলেন সানজিদুল। গবেষণা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে আলোকিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের যাত্রা শুরু করে সানজিদুলের এই সামাজিক প্রতিষ্ঠান লিটার অব লাইট বাংলাদেশ।
দিন-রাত যখন এক সমান
স্থায়ী সমাধান নিয়ে কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ যদি অনুদান দিতে চায়, সে ক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তাদের স্পন্সর হিসেবে যুক্ত করে তাদের অনুদানে নির্দিষ্ট প্রজেক্ট করে থাকেন। প্রতি মাসে একটি গ্রামকে আলোকিত করার জন্য নতুন ২০-২৫ জন স্বেচ্ছাসেবী নেওয়া হয়, যারা নতুনভাবে শিখে লাইট তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকেন। বর্তমানে তাদের টিমের পাশাপাশি রয়েছে ইঞ্জিনিয়ারিং টিম, সার্ভে টিম ও রিসার্চ টিম। আর ‘লাইটগিভার’-এ রয়েছে ৫০ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবী। অপারেশন টিমের সবাই এখন ফুলটাইম কাজ করছেন কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই।
যেভাবে লাইট তৈরি হয়
বর্তমানে এদের দুটি লাইটের মডেল, একটি সোলার ল্যাম্প যা বাসার ভেতরে আলোকিত করে, আরেকটি সোলার স্ট্রিটলাইট যা রাস্তা বা উঠান আলোকিত করে। খুব সহজলভ্য জিনিসপত্র যেমন ছোট সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, এলইডি, প্লাস্টিক বোতল এবং পিভিসি পাইপ দিয়ে এই লাইট তৈরি হয়, সঙ্গে একটি ছোট সার্কিট।
সঙ্গে যখন ফ্রান্সের এক স্কাউট দল
‘লিটার অব লাইট বাংলাদেশ’ নামক এই সামাজিক প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জানতে পারে ফ্রান্সের একটি স্কাউট টিম। গত এক বছর আগে তারা আগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে এসে এই প্রজেক্টের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখায়। ফ্রান্সের প্যারিসের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের এই পাঁচজন ছাত্রী গত জুলাইয়ে বাংলাদেশে এসে লিটার অব লাইট বাংলাদেশে এক মাসের টেকনিক্যাল ইন্টার্নশিপ করে লেগে যান বিভিন্ন প্রজেক্টের জন্য লাইট তৈরির কাজে।
তারা এখন আলোকিত
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরাপাড়া গ্রাম, যা ৫৭ বছর ধরে বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে। এই পাড়া আলোকিত করার লক্ষ্যে অনুদান পেয়ে গত ২০ জুলাই ফ্রান্স থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী এবং তাদের মূল টিম মিলে চার দিনে ২০টি স্ট্রিটলাইট এবং ৫০টি ল্যাম্প তৈরি করেন। প্রায় ৪০ জনের টিম সে রাতেই ক্যাম্প করে থেকে গেছেন ত্রিপুরাপাড়াতে আর লক্ষ্য করেছেন সারারাত স্ট্রিটলাইটের আলো ছড়ানোর আনন্দ।
সঙ্গে চাই সবাইকে
দেশকে অন্ধকারমুক্ত করতে লড়ে যাওয়া এই সামাজিক প্রতিষ্ঠান মনে করে, আলোকিত করার এই কার্যক্রমকে আরও বড় করতে চাই অন্যান্য বিভিন্ন সংগঠনকে, ‘যাদের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা সারাদেশে আলো পৌঁছে দেব, যাদের আমরা টেকনোলজি শেখাব, সঙ্গে তাদের টেকনিক্যাল সহায়তা করব। তারা নিজেদের স্বেচ্ছাসেবী দিয়ে লাইট ও অনুদান সংগ্রহ করলে এই প্রজেক্ট আরও দ্রুত ছড়িয়ে যাবে বলে আমি মনে করি’, বলেন সানজিদুল। বিনামূল্যে এই আলো ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগে যদি সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন কোম্পানি এগিয়ে আসে, তবে এক হয়ে সারাদেশের ৩.৫ কোটি বিদ্যুৎহীন ঘর আলোকিত হবে খুব সহজেই। তাদের ফেসবুক পেজের (www.facebook.com/LiterOfLightBD) সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে কেউ কাজ করতে পারবেন তাদের সঙ্গে।
শান : ৩.৫ কোটি মানুষের ঘরে বিদ্যুতের আলো নেই। কেরোসিনের বাতি দিয়েই কাজ সারে তারা। মাসিক আয়ের ৫ ভাগের এক ভাগ চলে যায় এই কেরোসিনের পেছনে। দেশে ৪০ লাখ ঘরে সোলার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও সেসব সোলার সিস্টেমের ক্রয়মূল্য অনেক বেশি, যেখানে নিজেরা বানালে তৈরিতে খরচ পরবে ১০ ভাগের ১ ভাগ। ঠিক এই সমস্যার সমাধানের জন্য ইনোভেটিভ একটি আইডিয়া দিয়ে বিনামূল্যে সবার ঘরে আলো পৌঁছানোর কাজটাই করে লিটার অব লাইট বাংলাদেশ। লিটার অব লাইট বাংলাদেশ মূলত গবেষণা নির্ভর সামাজিক প্রতিষ্ঠান। আমরা মূলত সোলার দিয়ে সহজে তৈরি করা যায় এমন দুটি লাইটের আইডিয়া নিয়ে কাজ করি, সোলার স্ট্রিটলাইট যা আলোকিত করে বাড়ির উঠান বা রাস্তা যা সন্ধ্যা হলে অটো জ্বলে উঠবে আর সূর্যোদয়ের সময় অটো বন্ধ হবে এবং সোলার ল্যাম্প যা আলোকিত করে ঘরের ভেতর। এই বাতিগুলো তৈরি করতে খুবই সাধারণ জিনিস লাগে যেমন ছোট সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, এলইডি, পিভিসি পাইপ এবং প্লাস্টিকের বোতল। আমরা এই প্রযুক্তি ওপেনসোর্স হিসেবে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য কাজ করছি, যাতে যে কেউ খুব সহজেই হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে স্বল্পমূল্যে এই বাতি তৈরি করতে পারে। আমরা প্রতিনিয়ত গবেষণা করছি এ রকম আরও নতুন নতুন আইডিয়া উদ্ভাবন করতে যা সহজেই রিপ্লিকেট করে যে কেউ সুবিধাভোগ করতে পারবে। আমরা প্রতি মাসে একটি করে প্রজেক্টের আয়োজন করি, স্পন্সরের অর্থে ২০-৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ৪-৫ দিন ওয়ার্কশপে আমরা ২০টি স্ট্রিটলাইট এবং ৫০টি ল্যাম্প তৈরি করি। তারপর সে লাইটগুলো আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চল যেমন পার্বত্য, চর, উপকূলীয়, দ্বীপ এবং বস্তি এলাকায় বিনামূল্যে বিতরণ করি। সঙ্গে আমরা স্থানীয়দের শেখাই কিভাবে তারা লাইট তৈরি করতে পারবে, যাতে আমরা যদি ৭০টি দেই তাঁদের ৭০০টি প্রয়োজন হলেও তারা বানিয়ে নিতে পারবে। আর আমরা চাই সারাদেশের সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে নিজ এলাকার জন্য লাইট তৈরি করবে আমাদের টেকনিক্যাল সহায়তা নিয়ে। সঙ্গে কিছু গরিব মানুষ আয়ের একটা সুযোগ পাবে এই লাইট তৈরি করে। আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার উদ্যোক্তা তৈরি করতে চাই। যেহেতু লিটার অব লাইট বাংলাদেশ একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, আমরা আমাদের সেবা থেকে কোন প্রকার আয় করি না। আমাদের কার্যক্রমের অর্থায়ন হয় স্পন্সর অথবা পার্টনারশিপ থেকে।
ডিপ্রজন্ম : আপনার পরিচয়টা পাঠকদের জন্য বলুন।
শান : আমি সানজিদুল আলম সিবান শান, বয়স ২৬। বাবা অবসরে, মা গৃহিণী, ছোট ভাই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষবর্ষে। আমি লিটার অব লাইট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। এই জীবন পরিবর্তনের প্রতিষ্ঠানের কারণে নিজেকে সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় দিতে পারি। মূল পেশায় আমি একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তা, ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট, ই-কমার্স, স্টার্টাপ ডেভেলপমেন্ট এবং ইনোভেশন বিশেষজ্ঞ। পড়াশোনা তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিএসসি। তবে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহের কারণে খুব কম বয়স থেকেই প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত হই, ২০০৮ সালে ১৬ বছর বয়সে প্রথম অনলাইন প্রফেশনাল হিসেবে কাজ শুরু করি। এরপর অনলাইনে কখনও ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক্স ডিজাইনার, কখনও ফ্রিল্যান্স ওয়েব ডিজাইনার, কখনও প্রোগ্রামার। ২০১০ থেকে ডিজিটাল মার্কেটিং, স্ট্র্যাটেজি, প্ল্যানিং এবং নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার প্রতি ঝোঁক বাড়াতে এই বিষয়গুলোতেই আটকে যাই। বিভিন্ন সময় ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজি এবং ডিজিটাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কখনও ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট আবার কখনও অফশোর জব করি লম্বা একটা সময়। আমেরিকা, ভারত এবং চায়নার অনেক ছোট-বড় টেক কোম্পানি ও ডিজিটাল এজেন্সিতে অফশোর জব করি। ২০১২ এর পর যখন দেশের ই-কমার্স এবং স্টার্টাপ মার্কেট বড় হচ্ছিল, তখন দেশের ইন্ডাস্ট্রির দিকে সময় দেই। ফিনটেক, এডটেক (এডুকেশন টেকনোলজি), ই-কমার্স, ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেছি।
ডিপ্রজন্ম : সম্প্রতি একটি এলাকা আলোকিত করেছেন আপনারা, সঙ্গে ছিল বিদেশি ভলান্টিয়াররাও। এ সম্পর্কে বলুন।
শান : যা বলেছি আগে আমরা মূলত একটি প্রজেক্ট করি প্রতি মাসে। আমরা প্রথমে একটি গ্রাম ঠিক করি, তারপর স্পন্সরের কাছে দেখাই, তারা রাজি হলে আর্থিক সহায়তা নিয়ে আমরা স্বেচ্ছাসেবী বাছাই করি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি থেকে। তারপর আমরা জিনিসপত্র কিনে আনি। একটি জায়গায় আমরা ৪ দিনের ওয়ার্কশপ করি, যেখানে সেই ২০-৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং টিমের তত্ত্বাবধানে ৭০টি লাইট তৈরি করে পূর্বের কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই। গত মাসে সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরাপাড়া আলোকিত করার উদ্যোগ নেই আমরা। আমরা চট্টগ্রাম থেকে ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী নেই, এবং সুদূর ফ্রান্সের প্যারিস থেকে আমাদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত হতে আসে ৫ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। ঠিক ৪ দিনে ২০টি স্ট্রিটলাইট এবং ৫০টি ল্যাম্প তৈরি করে এই স্বেচ্ছাসেবীরা। এরপর আমরা প্রায় ৩০ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবী টিম সেই ত্রিপুরাপাড়ায় যাই সব লাইট নিয়ে। সেই গ্রামে ৪০০ জন মানুষের বসবাস, যারা ৫৭ বছর ধরে বিদ্যুতের আলো পায়নি। সেই গ্রাম এখন আলোকিত। স্থানীয়দের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাসেবীরা সেই স্ট্রিটলাইটগুলো নিজেরাই স্থাপন করে গ্রামে। দৃশ্যটা দেখার মত ছিল যখন অন্ধকার এক গ্রামের উঠান হঠাৎ সূর্যাস্ত হতেই আলোকিত হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাচ্চারা, মহিলারা খুশিতে আত্মহারা, আর আমরা যারা লাইটগুলো তৈরি করেছি তাদের জন্য এটি একটি স্বপ্নের মুহূর্ত ছিল। সেই ত্রিপুরাপাড়ার প্রত্যেকটি ঘর এখন আলোকিত। এর ১০ দিন পর আমরা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির উদালিয়া গ্রামে আরও একটি ত্রিপুরাপাড়া আলোকিত করি। এই পাড়ার একাংশতে আমরা লাইট দেই, যে লাইটগুলো তৈরি করে সেই ফ্রান্স থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবীরা একাই। তাঁদের ইচ্ছে ছিল তারা নিজেরাই একটি ছোট প্রজেক্ট করে আলোকিত করবে।
ডিপ্রজন্ম : ফ্রান্স থেকে আগত স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যাপারে বলুন।
শান : বছর খানেক আগে থেকেই তারা বাংলাদেশে এসে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চাচ্ছিল। তারা প্যারিসের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। এই সামাজিক কাজে যুক্ত হওয়ার জন্য দুবছর পার্টটাইম চাকরি করে টাকা জমিয়েছে। তারা স্বেচ্ছাসবী হিসেবে ৭ দিন কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে লিটার অব লাইট বাংলাদেশে টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে ১ মাস কাজ করে। তারা লিটার অব লাইট বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাকে এ বছরের শেষের দিকে প্যারিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের স্টোরি শেয়ার করার জন্য।
ডিপ্রজন্ম : রক্তদাতা খোঁজা নিয়ে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাজ করছেন। বিস্তারিত জানতে চাই
শান : এদেশে বছরে ১১ লাখ ব্যাগ রক্ত লাগে, যেখানে এখনও ঘাটতি আছে ৩ লাখ ব্যাগ। এই সমস্যার মূল কারণ সঠিক সময়ে সঠিক রক্তদাতা তথ্য পান না। প্রযুক্তির এ সময়ে এই সমস্যার সমাধান সহজেই করা যায়। ইতোমধ্যেই প্রায় ডজন খানেক রক্তদাতা এ্যাপ, ওয়েবসাইট ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। এ রকম উদ্যোগে ৫% হলো প্রযুক্তি তথা এ্যাপ বা ওয়েবসাইট, বাকি ৯৫% হলো পরিচালনা, প্রচার, উত্তরোত্তর উন্নয়ন। শুধু এ্যাপ বানালেই কাজ শেষ নয়। এটা একটা প্রকল্প। যেহেতু আমি ডিজিটাল সার্ভিসগুলোর ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করেছি, আমি আশাবাদী এই প্ল্যাটফর্ম উন্মুক্ত করলে বড় সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।
ডিপ্রজন্ম : আপনি চট্টগ্রামে বসেই দেশের বিভিন্ন তরুণ সেলিব্রেটি বা ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে পরিচিত, এই নেটওয়ার্কিং সম্পর্কে বলুন।
শান : এই প্রতিযোগিতার যুগে নেটওয়ার্কিং এর বিকল্প নেই। আমি আজ এটুকু এসছি এই নেটওয়ার্কিংয়ের কারণে, ইন্টারভিউ ছাড়াই চাকরি বা উদ্যোগের জন্য বড় কোম্পানির স্পন্সর, এ সবই সম্ভব হয়েছে ফেসবুক ও লিংকডইন নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে। ৫ বছর আগে টিভিতে ইন্টারভিউ দেখে ভেবেছিলাম আমি কখনও যেতে পারব কিনা, সেই একই অনুষ্ঠানে আমি ইন্টারভিউ দিয়েছি। নেটওয়ার্কিংয়ের কারণেই তারা আমাকে চিনেছে, আমার কাজের গুরুত্ব বুঝেছে, আর আমিও বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শিখতে পেরেছি।
ডিপ্রজন্ম : চট্টগ্রামে স্বেচ্ছাসেবী কাজ করার সুবিধা, সমস্যা?
শান : চট্টগ্রামে স্বেচ্ছাসেবী কাজে বেশ সীমাবদ্ধতা আছে। স্বেচ্ছাসেবা বা উন্নয়নমূলক কাজ বলতেই শীতবস্ত্র, ইফতার, ত্রাণ বিতরণ এসব কাজেই সীমাবদ্ধ। এসব কাজ বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এসবে স্থায়ী উন্নয়ন হয় না। স্বেচ্ছাসেবী কাজের ক্ষেত্রে ‘সার্টিফিকেট’ প্রথা চালু হয়েছে। শীতবস্ত্র বিতরণ করলেও সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এখন স্বেচ্ছাসেবাতে আসতে চাওয়া অনেকেই সার্টিফিকেটকে মুখ্য অর্জন ভেবে নিচ্ছে, যার কারণে এই মহৎ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এর মাঝেও কিছু সংগঠন আছে যারা বেশ ভাল কাজ করে যাচ্ছে, যেমন ছিন্নমূলদের নিয়মিত পড়ানো, গরিব শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ভর্তি কোচিং দেয়া, গরিবদের স্বাবলম্বী করে দেয়া। এসব কাজে অনেক শিক্ষার্থী আগ্রহী হচ্ছে।
ডিপ্রজন্ম : এ ধরনের প্রজেক্ট একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নিতে গেলে প্রচুর সময়, অর্থ, জনবল দরকার। আপনার স্বপ্ন কী?
শান : লিটার অব লাইট বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য তিনটি, এক. গবেষণার মাধ্যমে এমন সব আইডিয়া উদ্ভাবন করা, যা যে কেউ রিপ্লিকেট করতে পারে, তারপর এই আইডিয়া উন্মুক্ত করে দেয়া।
দুই. নিজেরা স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতায় লাইট তৈরি করে বিতরণ করা।
তিন. দেশের সাড়ে ১৩ হাজার নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন এবং এক লাখের বেশি অনিবন্ধিত সংগঠনকে একসঙ্গে নিয়ে দেশের ৩.৫ কোটি মানুষের জন্য লাইট তৈরি করা। আমরা চাই দেশের সব সংগঠন আমাদের কাছ থেকে কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে নিজেরাই নিজেদের এলাকার গরিবদের জন্য লাইট তৈরি করবে। আমরা চাই গরিব কিছু মানুষকে লাইট তৈরির প্রক্রিয়া শিখিয়ে দিয়ে তাঁদের আয়ের একটা পথ তৈরি করতে। তারা তাঁদের এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে লাইট তৈরি করবে, আর একটা ছোট মজুরি ধার্য করবে। ফেসবুক, ইউটিউবের মাধ্যমে আমরা ভিডিও পাবলিশ করব কিভাবে লাইট তৈরি করতে হয়, বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ওয়ার্কশপ করছি লাইট তৈরি শেখানোর জন্য, যাতে তারা নিজ নিজ এলাকায় উদ্যোগ নিয়ে লাইট বিতরণ করতে পারে। আর সর্বশেষে আমাদের আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন কোম্পানি এবং দাতা সংস্থা যদি এগিয়ে আসে, আমরা এ দেশের সব জায়গায় আলো পৌঁছে দিতে পারব একদিন। আশার কথা হলো জাতিসংঘের একটি দাতা সংস্থা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চুক্তির আওতায় তারা আমাদের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি প্রোডাকশন হাব তৈরি করবে। যেখানে আমরা ২০-৩০ জন রোহিঙ্গাকে শেখাব কিভাবে লাইট বানাতে হয়। তারা ওই সংস্থার আর্থিক সহায়তা এবং আমাদের তত্ত্বাবধানে লাইট তৈরি করবে, আর একটা পারিশ্রমিক পাবে। এছাড়া বিভিন্ন কর্পোরেট কোম্পানি প্রজেক্ট বেসিসে আমাদের স্পন্সর করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। আর লন্ডনভিত্তিক একটি দাতা সংস্থার সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে, তারা আমাদের একটি স্থায়ী প্রোডাকশন ল্যাব পরিচালনার ব্যাপারে সাহায্য করতে আগ্রহী। আমি বিশ্বাস করি, বিশালসংখ্যক তরুণরা নিমিষেই সমস্যার সমাধান করতে পারে যদি সবাই শুরু করে।
আমি চাই এই আইডিয়াটা দেশের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে যাক, যেখানে হয়ত আমাকে বা লিটার অফ লাইট বাংলাদেশকে কেউ চিনবে না, কিন্তু আলোকিত হবে জীবন।
0 comments:
Post a Comment